মহাভারতের মতো বিশাল বিশ্বকোষ এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে ধরন, রাজনীতি, যুদ্ধ, দান, তপস্যা, শিক্ষা — সব বিষয়ের চর্চা আছে। সেই মহাগ্রন্থের অন্যতম প্রসিদ্ধ উক্তি — “অহিংসা পরমো ধর্মঃ।” ছোট্ট এই শব্দগুচ্ছ ভারতীয় নীতিদর্শনের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠেছে। গান্ধীজির অহিংসা আন্দোলন, বৌদ্ধ ও জৈন পরম্পরা — সবাই এই সূত্র থেকে শক্তি নিয়েছে। কিন্তু “পরম ধর্ম” বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা কম হয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা সেই গভীরে যাব।
॥ अहिंसा परमो धर्मः धर्महिंसा तथैव च ।
परस्परविरुद्धे तु धर्मौ नैवावगच्छति ॥ অহিংসা পরম ধর্ম; আবার ধর্মের রক্ষার জন্য প্রয়োগ করা হিংসাও (পরিস্থিতিতে) পাপ নয়। এই দুই ধর্ম পরস্পরবিরোধী, এ কথা বুঝলে প্রকৃত ধর্ম বোঝা যায়। (অনুশাসনপর্ব)
অহিংসা মানে কী — ধ্বংস নয়, জয়
“অহিংসা” শব্দটি গঠিত হয়েছে “হিংসা” শব্দের আগে “অ” প্রত্যয় যোগে — অর্থাৎ হিংসার অভাব। হিংসা শুধু মেরে ফেলা নয়; কষ্ট দেওয়া, অপমান করা, মিথ্যা বলা, চুরি করা — সবই এক অর্থে হিংসা। অহিংসা তখনই সর্বদা সফল হয় যখন আমাদের কোনো ক্ষতি করার ইচ্ছাই না থাকে — হাতে না, মনে না, কথায় না। একে ত্রয়ী অহিংসা বলা চলে। শাস্ত্র বলেন — যিনি সব প্রাণীর প্রতি এমন উদার, তিনিই আসল ধনী; কারণ তার শক্তি সর্বদা সবার কাছে শ্রদ্ধেয়।
ধর্মরক্ষার্থ হিংসা — উত্তম ব্যবহার
যিনি দ্বিতীয় পঙক্তিটি পড়ে আঁতকে ওঠেন — “ধর্মহিংসা তথৈব চ” — তার জন্য বলা দরকার, শাস্ত্র জটিল পরিস্থিতির কথা রেখেছে। রাক্ষস কিংবা অন্যায়কারীকে প্রতিরোধ না করলে যে নিরীহরা মুছে যায়, সেই প্রতিরোধকে শাস্ত্র অন্যায় বলে না। রাম রাবণের মতো দুর্দমনীয়কে যুদ্ধে বধ করেন, কারণ তাঁকে অব্যাহতি দিলে অসংখ্য সাধু-মুনি বিপন্ন হত। তাই অহিংসা নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি সক্রিয় সাত্ত্বিক প্রতিরোধ। সমাজে আইন, পুলিশ, সেনাবাহিনী ভদ্র ও মন্দকে পৃথক রাখতেই আছে — এই শৃঙ্খলাই ছোটদের রক্ষা করে।
গীতা ও রামায়ণের দৃষ্টিকোণ
গীতায় কৃষ্ণ অর্জুনকে কর্মযোগে যুক্ত হতে বলেছেন — যুদ্ধ করতে হলে ন্যায়ের জন্যই যুদ্ধ করো, কামনা-দ্বেষ বর্জন করে। অর্থাৎ ব্যক্তির প্রতি দ্বেষ নয়, তবে অন্যায়ের প্রতিরোধ অবশ্যই। রামায়ণে রাম দুজনকে দ্বৈরথে আক্রমণ করেননি; কিন্তু সামগ্রিক রাক্ষস-নিপীড়ন বন্ধ করতে সেনা সংঘটিত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় — প্রাচীন দর্শনে অহিংসা কাপুরুষের নয়, ক্ষমাশীল বীর্যের। যার পক্ষে প্রতিরোধ করার শক্তি নেই, তার ক্ষমা খ্যাতি পায় না। তাই শ্লোকের সংসারে রাম আজও আদর্শ।
সমাজ ও পরিবেশে অহিংসার প্রয়োগ
অহিংসা শুধু মানুষের মাঝে নয় — প্রাণী, পরিবেশ, বৃক্ষ সবার প্রতি। আদি ঋষিরা বৃক্ষকে “বৃক্ষ” শব্দে ব্যাখ্যা করেছিলেন — ছায়া-ফল দেয় বলে। আমাদের সংসারে নিষ্ঠুর ভাষা, কটূক্তি, সামাজিক বর্জন — এই নরম হিংসাগুলোও অহিংসার পরিধিতে আসে। গবেষণায়ও দেখা যায়, সহানুভূতিশীল পরিবেশে শিক্ষার্থীরা ভালো শেখে। পরিবেশ ধ্বংসী শিল্প কোন অর্থে “উন্নয়ন”, তা আমরা এখন বুঝছি। অতএব অহিংসা এক সামাজিক পরিকল্পনা — যা অনেক বড় ক্ষতিকে থামায়।
দৈনন্দিন অনুশীলন
প্রতিদিনের জীবনে অহিংসার চর্চা সম্ভব। প্রথমে নিজের কথার দিকে খেয়াল রাখুন — অপমানকর সমালোচনা, গুজব, বিদ্রূপ বন্ধ করুন। দ্বিতীয়ত অযুক্তিহীন রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন। তৃতীয়ত ক্ষমা করার ক্ষমতা বাড়ান। চতুর্থত সবার প্রতি সমান মর্যাদা। এই অভ্যাসগুলো মুক্ত করে সমাজের ভেতর শান্তি। গ্রামে-শহরে ঝগড়ার বেশিরভাগই অহংকার ও অসম্মানবোধ থেকে — অহিংস আচরণ তা দূর করে।
অহিংসা মানে দুর্বলতা নয়
একটি ভুলধারণা প্রচলিত — যার মাথা নিচু, সে-ই অহিংস। আসলে অতি বিপজ্জনকও ক্ষমা দেখাতে পারে। যেমন হনুমান জ্বালিয়ে সিংহপুচ্ছ দিয়ে অহংকার গুড়িয়ে দেননি, কিন্তু সামাজিক নিন্দা, প্রতিশোধ নয় — সে ভীষ্ম তাঁদের দক্ষিণা দিতে চেয়েছিলেন। প্রকৃত বীরের অহিংসা শক্তির অহংকার নয়, শক্তির নিয়ন্ত্রণ। এই বুঝতেই ব্যক্তিগত, পারিবারিক, জাতীয় তিন স্তরে সমাজ ভঙ্গুর হিংসা বন্ধে বদ্ধপরিকর থাকবে।
উপসংহার
“অহিংসা পরমো ধর্মঃ, ধর্মহিংসা তথৈব চ” — দুটি পঙক্তি মিলিয়ে ধর্মের জটিল চেহারাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়: শান্তির পথ সর্বাগ্রে, কিন্তু অন্যায়ের কাছে নতি নয়। যেখানে নিরীহকে রক্ষা করা দরকার, সেখানে ধর্মসহ হিংসাত্মক প্রতিরোধ নিজেই ধর্ম। জীবন ছোট, সিদ্ধান্ত কঠিন; কিন্তু প্রাচীন বাণীর এই সমতায় আমরা প্রতিদিনের মুঠো ফোনে, বাজারে, অফিসে সঠিক পথ খুঁজতে পারি। শান্তি থেকে শক্তি, শক্তি দিয়ে শান্তির রক্ষা — এই সূক্ষ্ম সাম্য হিমালয় গমনে প্রয়োজন।
মহাভারতে অহিংসার প্রসঙ্গ-কাহিনি
মহাভারত শুধু যুদ্ধের কথা নয়; এতে অহিংসা ও করুণার অসংখ্য গল্প আছে। ভীষ্মের কাছে দ্রৌপদীর অসম্মানের ঘটনায় আমরা দেখি, নীরব থাকাও এক ধরনের হিংসা — কারণ অন্যায়ের সাক্ষী থেকে থেকেও প্রতিবাদ না করা নিরীহকে বিপদে ফেলে। মহাভারতের আরেক পর্বে আবার ব্যাসদেব বলেছেন, কাউকে অপমান করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, প্রতারণা করা — এইসব নৈতিক হিংসা শারীরিক হিংসার চেয়ে মারাত্মক, কারণ এগুলো আত্মাকে কলুষিত করে। যুধিষ্ঠির যখন রাজ্য হারিয়ে বনবাসে যান, তখন তাঁর সঙ্গে সন্ন্যাসী ও ঋষিদের আলোচনায় অহিংসা ও দয়ার ভাব গভীরভাবে আলোচিত হয়। এই প্রসঙ্গগুলোই বুঝিয়ে দেয় যে, মহাভারত অহিংসাকে কেবল কথায় যুদ্ধবিরতি নয়, মন, বাক্য ও কর্মের ত্রিবিধ শুদ্ধতা বলেই দেখেছে।
মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রেই সর্বশ্রেষ্ঠ অহিংসার শিক্ষা দিয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ। অর্জুন যখন ভাই, গুরু, আত্মীয়দের হত্যার চিন্তায় অস্ত্র ফেলে দেন — তখন কৃষ্ণ তাঁকে বলেন, মানুষকে অবশ্যই নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে; অযথা রক্তপাত নয়, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিস্ক্রিয়তা ধর্ম নয়। অর্জুনের ক্ষণিক অহিংসা আসলে ছিল আত্মার মায়া ও দ্বিধা; তাকে কৃষ্ণ কর্মের সঠিক অর্থ শিখিয়েছেন। এরপরও মহাভারতে আছে অশ্বত্থামা, দ্রোণাচার্যের মতো চরিত্র, যারা প্রতারণা করে জয়ের চেষ্টা করেছিল এবং অনুতপ্ত হয়েছিল। এই সব কাহিনি মিলিয়ে মহাভারতের বার্তা স্পষ্ট — অহিংসা ত্যাগের পরাক্রম, কিন্তু ন্যায়কে ত্যাগ করার কোনো ছাড় নেই। যেখানে নিরপরাধকে রক্ষা করা যায়, সেখানে অহিংসা ও হিংসার সীমানা ধর্মবিচারেই নির্ধারিত হয়।
জৈন-বৌদ্ধ অহিংসার আলোচনা
ভারতীয় ইতিহাসে অহিংসার সর্বোচ্চ দর্শন জৈন ও বৌদ্ধ পরম্পরায় বিকাশ লাভ করেছে। জৈনধর্মে অহিংসা তো পরম ধর্মেরও ঊর্ধ্বে — সেখানে ‘অহিংসা পরমো ধর্মঃ’ শুধু নয়, অহিংসা পরম ধর্ম, অহিংসা পরম তপ, অহিংসা পরম দান বলা হয়েছে। জৈন সন্ন্যাসীরা পথ চলার সময় ঝাড়ু দিয়ে পিপিলিকাও মাড়ান না, কারণ প্রতিটি প্রাণে জীবাত্মা বাস করে। এই চরম অহিংসা আত্মশুদ্ধির পথ — ভোগ-বাসনা, ক্রোধ, অহংকার সব কাটিয়ে উচ্চতর আত্মার সাধনা। বৌদ্ধধর্মেও অহিংসা অষ্টাঙ্গিক পথের ভিত্তি; গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, ‘জয় করে ঘৃণা যায় না, ঘৃণা যায় অঘৃণাতেই’ — অর্থাৎ শত্রুতার উত্তর শত্রুতা দিয়ে নয়, মৈত্রী দিয়ে দিতে হয়। ভিক্ষুদের প্রথম শীল হলো প্রাণিহত্যা থেকে বিরত থাকা, এবং সম্রাট অশোক সেই শীলেই রাজ্য শাসন করেছেন।
জৈন ও বৌদ্ধ দর্শন আমাদের শেখায়, অহিংসা শুধু বাইরের কাজ নয় — এটি অন্তরের মঙ্গলভাব। ক্ষুদ্র পিপিলিকা থেকে বৃহৎ প্রাণী — সবার প্রতি সমান দয়া। তবে এই দুই পরম্পরাও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি স্বীকার করেছে; বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিজেকে রক্ষার জন্য আত্মরক্ষামূলক শারীরিক প্রতিরোধের আশ্রয় নিতে পারতেন। ভারতের এই দুই ধর্মের অহিংসার চর্চা পরবর্তীকালে গান্ধীজির উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যিনি জৈন পণ্ডিত ও বৌদ্ধ আচার্যের আলোচনা থেকে অহিংসাকে জাতীয় আন্দোলনের অস্ত্র বানিয়েছিলেন। এমন পরম্পরা থেকে আমরা এটুকু শিখতে পারি — অন্তরে মৈত্রী, বাক্যে মাধুর্যময়তা, আর কর্মে নির্ভীক ধর্মপালনই প্রকৃত অহিংসার পরিচয়। ধর্ম যত গভীর, সহনশীলতা তত বেশি।
সত্যগ্রহ ও অহিংস আন্দোলনের আধুনিক প্রয়োগ
বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ অহিংসার প্রয়োগ ছিল মহাত্মা গান্ধীর সত্যগ্রহ। গান্ধী অহিংসাকে নিষ্ক্রিয় ক্ষমা নয়, বরং সবচেয়ে সক্রিয় শক্তি বলে চিহ্নিত করেছেন — যে শক্তি অন্যায়কারীকেও জয় করে, তাকে পাপ থেকে ফেরায়। চম্পারণ, দান্ডি, অসহযোগ, স্বদেশি — প্রতিটি আন্দোলন তাঁর হাতে ছিল অহিংস যুদ্ধ, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা শারীরিক বলপ্রয়োগ করেননি, কিন্তু নিজেদের নৈতিক উচ্চতা দিয়ে সরকারের ন্যায়ের অভাব উন্মোচন করেছেন। গান্ধী বলতেন, ‘অহিংসা আমাদের অস্ত্র, সত্যই আমাদের লক্ষ্য।’ এই সত্যগ্রহ শুধু ভারতবর্ষে নয়; মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা উভয়েই গান্ধীর অহিংস নীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় নাগরিক অধিকার আন্দোলন পরিচালনা করেছেন।
আধুনিক সমাজে অহিংস আন্দোলনের প্রয়োগ পরিমণ্ডল আরও বিস্তৃত। বন-জঙ্গলের রক্ষায়, নদী বাঁচানো আন্দোলনে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে, শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় — সর্বত্র সহিংসতা ছাড়া প্রতিবাদের পথই অধিক টেকসই। সংবাদপত্র, আদালত, জনমত — এগুলো অহিংস প্রতিবাদের আধুনিক মঞ্চ। তবে অহিংসা মানে দুর্বলতা নয়; সত্যগ্রহীর কাছে প্রতিটি ক্ষমা, প্রতিটি নিজের ক্ষতি স্বীকার হওয়া উচিত নইলে তা ভীরুতা হয়ে যায়। গান্ধী নিজেও বলেছেন, অহিংসা শুধু শক্তিশালীরাই পালন করতে পারে, দুর্বলের কাছে তা ভীরুতার ছদ্মবেশ মাত্র। তাই অহিংস আন্দোলনের শক্তি আত্মিক সাহসে, বিশ্বাসে এবং ন্যায়ের প্রতি অনড় নিষ্ঠায়।
দৈনন্দিন নিষ্ঠুরতার পরিহার
অহিংসার চর্চা কোনো দূরের যুদ্ধের বিষয় নয়; শুরু হয় আমাদের দৈনন্দিন ছোট ছোট আচরণে। রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় পশুকে বাঁচানো, বাড়ির কুকুর-বিড়ালকে যত্ন করা, পাখিদের জন্য জল রাখা — এইসব ক্ষুদ্র করুণাই অন্তরের অহিংসাকে পুষে। পাশাপাশি নজরে আনতে হবে নীরব নিষ্ঠুরতাগুলো — কেউ কারও সম্পর্কে অপমানজনক মন্তব্য করা, শিক্ষার্থীকে কটূক্তি করে বিচলিত করা, সহকর্মীকে সামাজিকভাবে বর্জন করা। এগুলো শারীরিক আঘাত না করলেও মানসিক হিংসা — আর মানসিক ক্ষত কখনও শারীরিক ঘার চেয়ে গভীর। আমাদের ভাষাই যেন অহিংস হয় — রাগে কখনও এমন কথা না বলা, যা অন্যের আত্মসম্মানে আঘাত করে। এই অনুশীলনই প্রথম পদক্ষেপ পরম অহিংসার।
পরিবারেও অহিংসার চর্চা প্রয়োজন। শিশুকে শাসন করার নামে মারধর নয়; বোঝানো ও শেখানোই শ্রেয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ থাকলে নীরব তিক্ততা না বাড়িয়ে, ভদ্র কথায় মীমাংসা। বাড়ির কাজে সাহায্যকারী, গৃহকর্মী, চালকের প্রতি সু-আচরণই তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষা করে। প্রতিবেশীর প্রতি হিংসা, হঠকারিতা পরিহার করে সহানুভূতি গড়ে তুললে গ্রামে-শহরে শান্তি বজায় থাকে। এমনকি ইন্টারনেটের জগৎও বাদ যায় না — সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো, কারও ছবি অসম্মতিতে পোস্ট করা, কটূক্তি করা — এসবই আধুনিক হিংসার রূপ। তাই প্রতিদিন টেক্সট পাঠানোর আগে, কমেন্ট করার আগে একবার ভাবুন — এই শব্দ কি কাউকে আহত করবে? এই সামান্য সচেতনতাই অহিংসাকে দৈনন্দিন সংস্কৃতিতে রূপ দেয়।
ক্ষমার সঙ্গে বিচারের তুলনা
অহিংসার অন্যতম কঠিন অঙ্গ হলো ক্ষমা। ক্ষমা মানে অপরাধ ভুলে যাওয়া নয়, তবে তা প্রতিশোধের বদলে আত্মিক মুক্তি। শাস্ত্র বলেছে, ক্রোধে প্রতিশোধ নিলে ক্রোধ আরও জ্বলে; ক্ষমা করলে ক্রোধের জ্বালা নিভে যায়। তবে ক্ষমা ও বিচার পরস্পরবিরোধী নয় — অন্যায়ের বিচার অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু বিচার হওয়া উচিত শাস্তির জন্য নয়, সমাজের শুদ্ধি ও অপরাধীর সংশোধনের জন্য। কোনো অপরাধীকে ন্যায়ের হাতে সোপর্দ করা অহিংসার বিরুদ্ধে যায় না; বরং তা প্রমাণ করে, আমরা ব্যক্তির প্রতি দ্বেষ না রেখে অন্যায়কে প্রতিরোধ করছি। ক্ষমা তখনই পূজনীয়, যখন বিচারক নিজে ন্যায়ের পথে আছেন; নইলে ক্ষমা অন্যায়কে উৎসাহ দেওয়ার নাম নেয়।
আদর্শ সমাজে এই দুইয়ের সমন্বয়ই প্রত্যাশিত — ক্ষমার হৃদয় এবং বিচারের মাথা। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও এই ভারসাম্য জরুরি। কেউ আমাদের গভীর আহত করলে, ভেতরের রাগকে ঠাণ্ডা করে, আমরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করি; যদি অপরাধটি অনিচ্ছাকৃত হয় বা অপরাধী আন্তরিক ক্ষমা চায়, তাহলে ক্ষমা দিয়ে সম্পর্ক রক্ষা করা বীরত্বের কাজ। অপরদিকে, যদি অপরাধটি পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকে বা সমাজের ক্ষতি হয়, তবে ন্যায়বিচারের জন্য আইন ও সমাজের দ্বারস্থ হওয়া কর্তব্য। এই দুটি পথ মিলিয়েই অহিংসা তার প্রকৃত রূপ পায় — কোমল হৃদয়ে, কিন্তু ন্যায়ের দৃঢ় প্রহরায়। এই দর্শনই মহাভারতের ‘অহিংসা পরমো ধর্মঃ, ধর্মহিংসা তথৈব চ’-এর মর্ম।