সঙ্ঘ পরিবার (Sangh Parivar) — ভারতীয় সমাজ-জীবনের এক বিস্তৃত আন্দোলন-জগৎ, যার কেন্দ্রে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দিন-শনির মতো বেড়ে উঠেছে সঙ্ঘের শাখা-প্রম্পরায় শিক্ষা, সেবা, সংস্কৃতি, ভাষা, কৃষি, শ্রম, ছাত্র-জীবন, নারী-জাগরণ, ধর্ম ও রাজনীতি — নানা পরিসরে জড়িত অর্ধশতাধিক সংগঠন। এই প্রবন্ধ একটি নিরপেক্ষ তথ্যকোষীয় পরিচিতি — স্বেচ্ছাসেবক সমাজের দৃষ্টিতে সঙ্ঘ পরিবারকে জানা ও বোঝা।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ — সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের জন্ম ১৯২৫ সালের বিজয়াদশমীর দিন নাগপুরে। সংস্থাপক ডা. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। সঙ্ঘের মূল প্রক্রিয়া দৈনিক "শাখা" — যেখানে স্বয়ংসেবকেরা যোগ, ব্যায়াম, খেলাধুলা, সমাজ-সচেতনতা ও চরিত্র-গঠনের অনুশীলন করেন। সঙ্ঘ নিজেকে একটি স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়; এর লক্ষ্য তারা নিজের ভাষায় রাখেন "ব্যারক্ত, নিজত্ববাদী সংগঠনে ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ" — ব্যক্তিগত চরিত্র সুগঠিত হলে ভালো সমাজ ও ভালো রাষ্ট্র আপনি আসে, এই বিশ্বাস তাদের। প্রতি শাখায় সংকল্প- পাঠ ও প্রার্থনা গাওয়া হয় — যার সুরে মাতৃভূমির প্রতি অনুরাগ, সংযম আর একনিষ্ঠ কর্মের শিক্ষা নিহিত।

॥ नमस्ते सदा वत्सले मातृभूमे त्वया हिन्दुभूमे सुखं वर्धितोहम् । महामङ्गले पुण्यभूमे त्वदर्थे ह्यपत्कार्यमस्तु ॥বাংলা অর্থ — মাতৃভূমি, তোমাকে নমস্কার; তোমার কোলেই হিন্দু-ভূমির সন্তান হয়ে আমি বেড়ে উঠেছি। পুণ্যভূমি, তোমার সেবার জন্যই যেন আমার সব কর্ম নিবেদিত হয়। সঙ্ঘ-প্রার্থনার এই উদ্ধৃতি।

১৯৪৮ সালে সঙ্ঘ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হলে পরবর্তীকালে সঙ্ঘ আবার আইনি স্বীকৃতি পায়। এরপর একের পর এক সংগঠন জন্ম নেয় — শিক্ষা থেকে শুরু করে দুর্যোগ-সেবা পর্যন্ত। এই সংগঠনগুলোর সম্মিলিত পরিচয়ই "সঙ্ঘ পরিবার" নামে প্রচলিত। কোনো সংগঠন স্বাধীন ও স্বতন্ত্র; এক-একটি নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করে, নিজ নিজ কার্যকেন্দ্রে।

শিক্ষা ও সেবার পরিসর — বিদ্যা ভারতী, সেবা ভারতী, বনবাসী কল্যাণ

শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যা ভারতী অখিল ভারতীয় শিক্ষা সংস্থান ভারতজুড়ে হাজার হাজার স্কুল ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান চালায় — যেখানে আধুনিক পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতচর্চার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেবা ভারতী দুর্যোগ, চিকিৎসা, স্বনির্ভরতা ও ত্রাণ-কার্যে কাজ করে — বন্যা, ভূমিকম্প, মহামারি, শীতছত্র — এ ধরনের প্রয়োজনে সঙ্ঘ-স্বেচ্ছাসেবকেরা সর্বাগ্রে পৌঁছন। বনবাসী কল্যাণ আশ্রম উপজাতীয় অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নে কাজ করে; এই সংস্থাগুলি প্রতিটি জেলায় শুরু হয় ছোট ছোট সেবা-শিবিরে।

ভারতীয কিষাণ সঙ্ঘ কৃষক-হিতৈষী আন্দোলন, সহকার ভারতী সমবায়-আন্দোলন, রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি (১৯৩৬) নারী-জাগরণ ও সংযমের শিক্ষায় কাজ করে। সমাজ-সংস্কৃতিতে সংস্কৃত ভারতী ও সংস্কার ভারতী — যথাক্রমে সংস্কৃত ভাষা ও লোকশিল্প-সংগীতের চর্চা। সেবা-দর্শনের এই প্রতিটি ধারাই ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ — এক-একটি সংগঠন নিজ ক্ষেত্রকে ঘিরে সম্প্রসারিত হয়েছে। বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের উপজাতি অঞ্চলে কাজ, সেবা ভারতীর অসহায়ের সেবা — প্রতিটি শাখাই স্বাধীন, কিন্তু মূল চেতনায় অভিন্ন।

সংস্কৃত ভারতী ও ভাষা-আন্দোলন

সংস্কৃত ভারতী ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত — লক্ষ্য সংস্কৃতকে ঘরোয়া, কথাবার্তার ভাষা (সংভাষণ) বানানো। এর "संस्कृतं संभाषणम्" শিবিরে অগণিত নাগরিক মৌখিক সংস্কৃত শিখেছেন; "সংস্কৃত গাথা-সপ্তাহ", ঘর-ভিত্তিক চর্চা, সংস্কৃত-রঙ্গমঞ্চ, বলবন্ধন — এই ধরনের নানা কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্কৃত ভারতীর কাজটিই সঙ্ঘ পরিবারের শিক্ষা-দর্শনের প্রাণ বলা যায় — ভাষার ভিতরে সংস্কৃতিচর্চা গড়ে উঠলে সমাজ স্বयंসংগঠিত হয়, এই তাদের অনুভব।

এই অধ্যায়ে, আমরা যে subhashitam.in-এ সংস্কৃত চর্চা করি — সেই পত্রাচার ও সুভাষিত প্রকল্পগুলির সঙ্গেই সংস্কৃত ভারতীর প্রদত্ত ভাষা-যত্নের আদর্শের মিল আছে। যারা সংস্কৃত শিখতে চান, তাদের জন্য সংস্কৃত ভারতীর বিনামূল্যের শিবির ও আমাদের সংস্কৃত পত্রাচার কোর্স দুই-ই পথ উন্মুক্ত করে।

ABVP — শিক্ষার্থী সংগঠন

অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP) ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত — ভারতে ছাত্র-সংগঠন হিসেবে সবচেয়ে পুরনো ও বড়গুলির একটি। ABVP-র মূল ভূমিকা ছাত্র-স্বার্থ, শিক্ষার মান, ন্যায় ধারা ও একটি সুস্থ সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা-পরিবেশের দাবিতে সংঘবদ্ধ ছাত্র-সংগঠন হিসেবে; এর নিজস্ব নেতৃত্ব বয়ে থাকে — সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব। প্রতি বছর "অখিল ভারতীয় আলোচনা" পত্রিকাও প্রকাশ করে পরিষদ। সংগঠনটির সঙ্গে সাঙ্কেতিকভাবে সঙ্ঘের সম্পর্ক থাকলেও, কার্যত ABVP একটি স্বাধীন ছাত্র সংগঠন।

VHP — বিশ্ব হিন্দু পরিষদ

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (Vishva Hindu Parishad) প্রতিষ্ঠিত ১৯৬৪ সালে বোম্বে শহরে — উদ্যোক্তা ছিলেন স্বামী চিন্ময়ানন্দ। পরিষদের লক্ষ্য হিন্দুধর্মকে সংগঠিত করা, ধর্মীয় সেবা পরিচালনা, হিন্দু ধর্মের প্রচার-প্রসার এবং সারা বিশ্বের হিন্দু সমাজের মধ্যে সংযোগ রক্ষা। শিবির, ধর্মকেন্দ্র, রথযাত্রা, এবং '৭০-৮০-এর দশকে বিখ্যাত "একাত্মতা যাত্রা" — যে যাত্রায় দেশজুড়ে গঙ্গাজলভরা কলস ও ভক্তি-অর্ঘ্য পৌঁছে দেওয়া হয় — পরিষদের ধারায় অন্যতম। পরিষদ ধর্মীয় পরিসরেই নিজের ভূমিকা বেশি দেখে এবং নানা সেবামূলক ও সাংস্কৃতিক কার্যকলাপে জড়িত।

বিজেপি ও জন-জীবন

ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় — জনসংঘের উত্তরসূরী হিসেবে। দল নিজেকে "ভারতীয় রাষ্ট্রদর্শন, মৌলিকত্ব, অখণ্ডতা ও স্বদেশী" আদর্শে ভরসা রেখে পরিচালিত বলে বর্ণনা করে। BJP ও সঙ্ঘ পারস্পরিকভাবে সম্মানিত হলেও দলটি একটি স্বাধীন রাজনৈতিক দল — ভোটব্যবস্থা, সংসদীয় গণতন্ত্র ও শাসন-প্রক্রিয়ায় দলের নিজস্ব দায়িত্ব থাকে। সঙ্ঘ পরিবারের নীতিধারায় রাজনৈতিক পরিসরে এই দলকেই মূল বাহন ধরা হয়। ABVP আবার ছাত্রপরিসরে, বিদ্যা ভারতী শিক্ষায় — জোটের প্রতিটি ধারা নিজ ক্ষেত্রে।

সঙ্ঘ পরিবার ও সমাজ-ধারণা

সঙ্ঘ পরিবারের সামগ্রিক সমাজ-দর্শনের মূল সূত্রটি একটাই — "সবকে সঙ্গে নিয়ে সবাইকে সম্পন্ন করা" («সব্যং সম্পন্ন» নয়, বরং সব্যের টোল)। সঙ্ঘের বহুল প্রচলিত স্লোগান "সেবা পরমো ধর্ম" — পরিবারের প্রতিটি শাখার কাজের পেছনে এ-ই অনুপ্রেরণা। সঙ্ঘ নিজে বলে, সমাজের একক — ব্যষ্টি — সুগঠিত হলে সমাজ ও রাষ্ট্র স্বয়ং সুন্দর হয়; তাই গোষ্ঠীবদ্ধ চরিত্র-গঠনই তাদের প্রধান চর্চা।

॥ संघशक्तिः कलौ युगे ।বাংলা অর্থ — কলিযুগে সংঘ-শক্তিই গুরুত্বপূর্ণ; একক চেষ্টায় নয়, সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় কঠিন কাজ সিদ্ধ হয় — এই সঙ্ঘ-দর্শনের মূল মন্ত্র।

উপসংহার

সঙ্ঘ পরিবার তাই একটি ছোট্ট এমন দৃষ্টিভঙ্গি নয়; এ-ই এক বিশাল সমাজ-আন্দোলন — যার প্রতিটি শাখা সেবা, শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতি, ছাত্র-জীবন, নারী-জাগরণ, কৃষি, শ্রমিক ও রাজনীতির এক-একটি দিক নিজ দায়িত্বে দেখে। কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে এই আন্দোলনের মূল চেতনা সামাজিক সংহতি ও আত্মবিশ্বাস; আর সেই সচেতনার ভিত্তিতে ভারতের বহু জাতীয় প্রকল্প — যেমন স্বচ্ছ ভারত অভিযান বা যোগ দিবস-আন্দোলন — জনসমর্থনের বিস্তৃত অংশ জুড়ে পেয়েছে। এই প্রবন্ধটি একটি তথ্যগত পরিচিতি মাত্র — পাঠকেরা যেন নিজস্ব বিচার-বুদ্ধিতে এই সংগঠনগুলিকে মূল্যায়ন করেন, সেইটাই আমাদের প্রত্যাশা।

যারা সঙ্ঘ পরিবার বা সংস্কৃত ভারতীর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে চান, তঁরা rss.org, samskritabharati.in বা এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সংগঠনগুলির আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইট থেকে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। সংস্কৃতচর্চা করতে চাইলে আমাদের সংস্কৃত পত্রাচার ও সনাতন অডিও প্রকল্পও কিঞ্চিৎ গৌরবের সঙ্গে স্মরণযোগ্য সহায়ক।